শনিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭

উমাইয়া যুগ (৬৬১-৭৫০ খৃঃ) এর সাহিত্যকগন

উমাইয়া যুগ (৬৬১-৭৫০ খৃঃ)

Ø   আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে উমাইয়া যুগ ৬৬১ হতে ৭৫০ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত। ইসলামী যুগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধায় এই যুগের বৈশিষ্ট্য অন্য যুগের বৈশিষ্ট্য হতে পৃথক স্বত্বার অধিকারী। এই যুগে যেমন বড় বড় কবি, সাহিত্যিক, মুহাদ্দিস, মুফাস্‌সির, আত্মপ্রকাশ করেছেন তেমনি ‘ওমার ইবনে ‘আবদুল আজিজের মত ন্যায়নিষ্ট খলীফা এবং হাসান আল-বাসরীর মত সেরা সূফীও আত্মপ্রকাশ করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) সর্বযুগের সেরা মুহাদ্দিস ও মুফাস্‌সির এই যুগেই আত্মপ্রকাশ করেছেন।

Ø   উমাইয়া যুগের প্রধানতম তিন বিখ্যাত প্রতিদন্দী কবি হলেন আখত্বাল, জারীর, ফারাযদা‘ক এবং পাঁচজন সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য কবি হলেন হুত্বাইয়া, আখত্বাল, ওমার ইবনে আবী রাবী’য়া, জারীর, ফারাযদা‘ক



১.  লাবীদ ইবনে রাবী‘আহ (৫৪৫-৬৬১খৃঃ) প্রাক-ইসলামী যুগে জন্মগ্রহণ করে, ইসলামী যুগ কাটিয়ে, যে কয়েকজন প্রখ্যাত কবি উমাইয়া যুগে মৃত্যু বরণ করেছেন, মহাকবি লাবীদ ইবনে রাবী‘আহ তাঁদের অন্যতম। তাঁর পুরো নাম أبو عقيل لبيد بن ربيعة بن مالك العامرى.আরবের বিখ্যাত عامر গোত্রে ৫৪৫ খৃষ্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ছিলেন দয়ার সাগর তাই তাঁকে ربيعة المقترين (দরিদ্র বান্ধব রাবী‘আহ) বলা হত। তাঁর কবিতা সম্পর্কে মহানবী (দঃ) এঁর বিখ্যাত উক্তিঃ اصدق كلمة قالها الشاعر كلمة لبيد الا كل شئ ما خلا الله باطل কোন কবির জীবদ্দশায় এইরূপ সম্মান খুব কম কবির ভাগ্যেই জুটেছে।

২.  হাস্‌সান ইবনে ছাবিত (৫৬৩-৬৭০খৃঃ)। আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে বিখ্যাত স্বাহাবী মুখাদ্বরিম কবি  شاعر الاسلام و شاعر الرسولহাস্‌সান ইবনে ছাবিত মদীনা শরীফের সুবিখ্যাত খায্‌রাজ বংশে ৫৬৩ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জনকের নাম ছাবিত এবং জননীর নাম ফারী‘আ বিনতে খালেদ। তাঁর জীবনের ষাট বছর পূর্ণ হলে তাঁর নিকট ইসলামের আহবান পৌছায়। সম্পর্কে তিনি ছিলেন নবী (দঃ) এঁর ভায়রাভাই।

৩.  হুত্বাইয়া (৬৮০খৃঃ)। মুখাদ্বরিম কবি হুত্বাইয়ার প্রকৃত নাম جرول بن اوس بن مالك তবে তাঁর অদ্ভুত আকৃতির জন্য তিনি حطيئة নামে সমধিক পরিচিত। তিনি আনুমানিক ৬০৫ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। মক্কা বিজয়ের কিছুদিন পর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন কিন্তু নবী (দঃ) এঁর ওফাতের পর তিনি পুনরায় মুরতাদ হন। অপরের কুৎসা রটনা করাই তাঁর মজ্জাগত স্বভাব ছিল। তাই তিনি মুসলমানদেরকেও ব্যাঙ্গ করতেন। রিদ্দার যুদ্ধে বন্দী হয়ে তিনি আবার ইসলাম গ্রহণ করেন। এবং কাদেসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

৪. আহনাফ ইবনে ‘কায়েস (৬১৯-৬৮৬খৃঃ)। তাঁর আসল নাম স্বাখ্‌র ইবনে ‘কায়েস অন্যমতে ضحاك بن قيس. তিনি আরবের বসরা প্রদেশের তামীম গোত্রের বিদগ্ধ শাখায় ৬১৯ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম হতে তাঁর পদযুগল বিকৃত (حنف) ছিল বলে তিনি আহ্‌নাফ নামে অধিকতর প্রসিদ্ধি লাভ করেন। তিনি ছিলেন বিকৃত দেহাবয়ব বিশিষ্ট মানুষ। তাসত্বেও তিনি ছিলেন শৌর্য বীর্যের অধিকারী বীর পুরুষ। বাল্যকালেই তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি অত্যান্ত ধর্মভীরু ছিলেন। নবী (দঃ) তাঁর জন্য দোওয়া করেছিলেন। জঙ্গে-জামাল ও অন্যান্য বহু যুদ্ধে তিনি তাঁর গোত্রের লোকদের নিয়ে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

৫. ‘আব্দুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাস (রাঃ) (৬১৯-৬৮৯খৃঃ)। মক্কার সম্ভ্রান্ত হাশেমী গোত্রের বিখ্যাত কোরায়েশ বংশে ৬১৯ খৃষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। কথিত আছে তাঁর জন্মের পর রসুলুল্লাহ্‌ (স্বাঃ) তাঁর কানে আজান শুনিয়েছিলেন। তিনি একাধিকবার রসুলুল্লাহ্‌ (স্বাঃ) এঁর দোওয়া লাভ করে ধন্য হয়েছিলেন। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) ছিলেন সর্বযুগের সেরা মুহাদ্দিস ও মুফাস্‌সির।

৬. জামিল ইবনে মা‘আ্‌মার (৬৬০-৭০১)। তাঁর পুরো নাম জামিল ইবনে মা‘আ্‌মার ইবনে সুবাহ্‌। তাঁর কুনিয়াত আবু ‘আমর। হিজাজের ওয়াদিউল কুরা গ্রামের উঝরা বংশে ৬৬০ খৃষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ ও পবিত্র প্রেমের অভিসারী। তাঁর পিতৃব্য-পুত্রী সুন্দরী বোছায়নার প্রেমে তিনি পতিত হন। এবং তাঁর প্রেমে তিনি বহু কবিতা রচনা করেছেন। কিন্তু তাঁর প্রেম ছিল দেহাতীত ও নিষ্কাম তাঁর সমকালীন প্রেমিক কবি ওমার বিন আবী রাবিয়ার সঙ্গে তিনি প্রায়শই দেখা করে স্বীয় রচিত কবিতা তাঁকে শোনাতেন। كثير عزة ছিলেন উমাইয়া যুগের একজন নামকরা কবি ও জামিলের শিষ্য এবং রাবী। তিনি ছিলেন প্রেমিক কুলের নেতা তথা ইমাম (امام المحبين). উঝরা বংশের সঙ্গে সম্পর্ক বিধায় এই গোষ্ঠীর কবিদের বলা হয় উঝারী কবি।

৭. আখত্বাল (৭১০খৃঃ)। আখত্বাল নামে সমধিক প্রসিদ্ধ, খৃষ্টান কবি আবু মালেক ঘিয়াস বিন ঘাওস বিন ত্বারেকা আরবের হিরা প্রদেশের তাঘলিব গোত্রে ৬৪০ খৃষ্টাব্দে ফুরাত উপকূলে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর অনেকগুলি ডাকনাম ছিল যেমন دوبل’ ذوالعبابة’ ذوالصليب اخطل. তিনি ছিলেন উমাইয়া গোত্রের কবি, মূলত আব্দুল মালেক ইবনে মারওয়ানের যুগে তিনিই ছিলেন একমাত্র রাজকবি। খৃষ্টান হওয়ার কারণে তিনি যখন খলীফা আব্দুল মালেকের দরবারে  নেশায় বিভোর হয়ে ঢুকতেন তখন তাঁর দাড়িতে ফোঁটা ফোঁটা সুরা লেগে থাকত।

৮. ওমার ইবনে আবী রাবী‘আ (৬৪৪-৭১১খৃঃ)। তাঁর ডাকনাম ابو    الخطاب   ’ ابو الحفصতাঁর জনক আব্দুল্লাহ্‌ ছিলেন মাক্কী ও জননী মাজদা ছিলেন ইয়ামেনী। তিনি কোরায়েশ বংশের মাখযুম পরিবারে ৬৪৪ খৃষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন সেই রজনীতে যে রজনীতে হজরত ওমার (রাঃ) শহীদ হন। তিনিই সর্বপ্রথম মুক্ত গযল রচনা করেন। তিনি ছিলেন নারিদের কবি। তিনি কোনদিন নরের প্রসঙ্গে কোন কবিতা রচনা করেননি। তিনি একই সঙ্গে বহু রমণীকে নিয়ে প্রেমের কবিতা রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন এই ধরণের গযল রচনার পথিকৃৎ ও দিকপাল। তাঁর নাম অনুযায়ী এই গোষ্ঠীর কবিদের বলা হয় উমারী ( عمرى Umarit) কবি।

৯. হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফ (৬৬২-৭১৩খৃঃ)। তিনি মুয়াবিয়ার খেলাফাতকালে ত্বায়েফের ছা‘কীফ গোত্রের আহলাক বংশে ৬৬২ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর উপাধি ছিল আবূ মুহাম্মাদ ও পদবি ছিল ছাকাফী। ইতিহাসে তিনি এক নিষ্ঠুর খলীফা হিসাবে পরিচিত।

১০.         ফারাযদা‘ক (৬৪১- ৭২৮/৭৩২খৃঃ)। তাঁর প্রকৃত নামআবূ ফেরাস হাম্মাম ইবনে ঘালেব ইবনে স্বা‘অ্‌স্বা‘অ্‌ তিনি বাসরায় ইয়ামামা নামক স্থানে তামীম গোত্রের দারেম বংশে বিংশ হিজরী মোতাবেক ৬৪১ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর ডাকনাম ফারাযদা‘ক যার অর্থ হল ‘কদাকার মুখশ্রী’ তাঁর মাতার নাম লীনা বিনতে ‘কারয্বা। তাঁর পিতামহ স্বা‘অ্‌স্বা‘অ্‌ ছিলেন বিখ্যাত স্বাহাবী যিনি জাহেলী যুগে চারশত শিশু কন্যাকে ক্রয় করে তাদেরকে জীবন্ত প্রোথিত হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছিলেন। খলীফা ওয়ালীদ ইবনে আব্দুল মালেক আখত্বালের পরিবর্তে ফারাযদা‘ককে তাঁর সভাকবির মর্যাদা দান করেছিলেন। ফলে তিনি হয়েছিলেন উমাইয়া খলীফাদের রাজকবি। Under Walid I, al-Farazdak become the officcial poet of the Caliph-Encyclopedia of Islam, (New) vol. II, p.788. তিনি ব্যক্তিগত জীবনে হাস্‌সান ইবনে ছাবিতের মত ভীরু স্বভাবের কবি ছিলেন। তাঁর জন্য বিখ্যাত স্বাহাবা আবু হুরায়রা (রাঃ) তওবা কবুল হওয়ার দোওয়া করেছিলেন।

১১. জারীর (৬৫৩-৭৭২খৃঃ)। তাঁর পুরো নাম জারীর ইবনে ‘আত্বিইয়া তিনি ইয়ামামার (বর্তমান রিয়াদ্ব এর নিকটস্থ) তামীম গোত্রের কুলায়েব শাখায় ৬৫৩ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সৎ চরিত্রের অধিকারী ও ধর্মভীরু মানুষ। তাঁর প্রেমের কবিতা নেই বললেই চলে। জারীর ছিলেন উমাইয়া যুগের তিন বিখ্যাত প্রতিদ্বন্দী কবির (আখত্বাল, জারীর,ফারাযদা‘ক) অন্যতম। এবং পাঁচজন সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য (হুত্বাইয়া, আখত্বাল, ওমার ইবনে আবী রাবী’য়া, জারীর,ফারাযদা‘ক) কবির অন্যতম সেরা কবি। তিনি ছিলেন উমাইয়া যুগের সবচেয়ে বড় কবি। তিনি ৮০ জন কবিকে হারিয়ে দিয়েছেন।



Ø   সবশেষে বলা যায় আখত্বাল, জারীর ও ফারাযদা‘ক তিনজনই উমাইয়া খলীফাদের সঙ্গে ও তাঁদের আমীর ওমারাদের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁরা সকলেই রাজনৈতিক সচেতনতা নিয়ে هجو ও مديح কবিতা রচনা করেছেন। একে ওপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ চিন্তাধারায় সেরা কবি। তবে নিরপেক্ষ সমালোচকদের মতে, উচ্চাঙ্গের কবিত্ব, গম্ভীর শব্দযুক্ত অর্থের দিক দিয়ে, ফারাযদা‘ক বড় কবি হতে পারেন। অলঙ্কার, কুৎসা ও প্রশংসার পরিপূর্ণতা, সুরা, সাকীর বর্ণনায় আখত্বাল বড় কবি হতে পারেন। কিন্তু সুন্দর গযল, মনোরমা উপমা, মনোহর শব্দ ও মধুর রচনাভঙ্গির সমাবেশে জারীর সকলের অপেক্ষা বড় কবি হতে পারেন।

‘ইসলামী যুগ’ (৬২২-৬৬১খৃঃ) এর সাহিত্যিকগণ

‘ইসলামী যুগ’ (৬২২-৬৬১খৃঃ)

‘ইসলামী যুগ’ আরবী সাহিত্যের ইতিহাসে সংক্ষিপ্ততম যুগ।

১.  উমাইয়া ইবনে আবিস্‌ স্বালত্‌ (৬২৪খৃঃ)। যে সমস্ত কবি প্রাক-ইসলামী যুগে জন্মগ্রহণ করে ইসলামী যুগে মৃত্যুবরন করেন কবি উমাইয়া তাঁদের অন্যতম। আরবের ত্বায়েফ শহরের বিখ্যাত ছা‘কীফ গোত্রে তাঁর জন্ম হয়। তিনি ছিলেন মুহাম্মাদ (দঃ) এঁর সমসাময়িক এবং তাঁর দূর সম্পর্কের আত্মীয়। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ মানুষ। তাঁর ধ্যান ধারণা ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। আরবী সাহিত্যের ইতিহাসকারগণ তাঁকে দার্শনিক কবি আখ্যা দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি ছা‘কীফ গোত্রের সেরা কবি। তাঁর সম্পর্কে নবী (দঃ) এঁর বিখ্যাত উক্তিঃ “ওর মুখটা ছিল ধার্মিক, কিন্তু ওর অন্তরটা ছিল পুরোপুরি অধার্মিক”

২. আল-আ‘অশা (৬২৯খৃঃ)। তাঁর জন্ম হয় নজদের ইয়ামামা অঞ্চলের মানফূহা গ্রামে, বাক্‌র ইবনে ওয়ায়েল গোত্রের আসাদ শাখায়। তাঁর পুরো নাম আবূ বুসায়ের মায়মুন ইবনে কায়েস ইবনে জানদাল। তবে তিনি আ‘অশা নামে অধিকতর পরিচিত। কারণ আ‘অশা নামের অর্থ হল দৃষ্টির শক্তির অল্পতা এবং তিনি অল্প দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর মাতুল মুসায়েব ইবনে আল্‌স এঁর রাবী ছিলেন। তিনি ছিলেন প্রাক-ইসলামী যুগের শেষের দিকের এবং ইসলামী যুগের প্রথম দিকের কবি। তিনি ছিলেন ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি। তাঁর কিছু কবিতাতে ইসলামী ধ্যানধারণার বর্ণনা পাওয়া যায়।

৩. আম্‌র বিন মা‘আ্‌দী কারেব (৬৪৩খৃঃ)। তিনি ছিলেন একজন বিখ্যাত যোদ্ধা ও মুখাদ্বরাম কবি। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ইয়ামেনের সম্ভ্রান্ত কাহ্‌তানী পরিবারে। জন্ম সূত্রে তিনি পৌত্তলিক। কিন্তু ৬৩১ খৃষ্টাব্দে তিনি তাঁর গোত্রের সমস্ত লোকের নিয়ে মদিনায় গমন করে নবী (দঃ) এঁর নিকট ইসলাম গ্রহণ করে ধন্য হন।

৪. আল-খানসা (রাঃ) (৬৪৬খৃঃ)। আরবের সুবিখ্যাত মহিলা কবি আল-খানসা নজ্‌দ প্রদেশের বিখ্যাত মুদ্বার গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন সম্ভবতঃ ৫৭৫ খৃষ্টাব্দে। তাঁর প্রকৃত নাম تماضر بنت عمرو بن الحارث بن الشريد بن . তাঁর কুনিয়াত উম্মে আম্‌র আর লকব আল-খানসা। তাঁর চেহারার সৌন্দর্য্য আর চারিত্রিক মাধুর্য্যের জন্য তিনি খানসা নামেই সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেন। জোশম গোত্রের নেতা তাঁর পাণিপ্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। পরে তিনি সুলামী গোত্রের মিরদাস বিন আমেরকে পতিত্বে বরণ করেন। তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই স্বাখ্‌রের মৃত্যুতে তিনি এক শোকগাঁথা রচনা করে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

৫. কাঅ্‌ব বিন যুহায়ের (রাঃ) (৬৪৭খৃঃ)। মুখাদ্বরিম কবিগোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান কবি সাহাবী কাঅ্‌ব বিন যুহায়ের (রাঃ)। তাঁর পিতা যুহায়ের বিন আবি সুলমা ছিলেন প্রসিদ্ধ মু‘আল্লা‘কা কবি। তাঁর মাতার নাম কাবাশাহ বিনতে আম্মার। কথিত আছে প্রথম দিকে কাঅ্‌ব ও তাঁর ভ্রাতা বুজায়ের নবী (দঃ) কে হত্যার ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু পরে কাঅ্‌ব নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইসলাম গ্রহণ করেন, এবং নবী (দঃ) এঁর জন্য বিখ্যাত قصيدة যা পাঠ করার পর নবী (দঃ) সন্তুষ্ট হয়ে স্বীয় উত্তরীয় তাঁর গায়ে জড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর ‘কাসীদাতুল বুরদা’র অনুকরণে শারফুদ্দীন আল-বুসিরী (১২১১-১২৯৪) ও নবী স্তুতিমূলক কবিতা রচনা করেন। এবং স্বপ্নে রসুলুল্লাহ (সাঃ) স্বীয় চাদর মুবারক তাঁর গায়ে জড়িয়ে দেন, সেটাও আরবি সাহিত্যের ইতিহাসে ‘কাসীদাতুল বুরদা’ নামে অভিহিত।



ইসলামী যুগের আরও কয়েকজন কবি সাহিত্যিক

১.  আমের বিন আত্‌-তোফায়েল (৬৩৩খৃঃ)। তিনি ছিলেন এজকন বীর সৈনিক ও তেজস্বী কবি। মু‘আল্লা‘কার বিখ্যাত কবি লাবীদ ছিলেন তাঁর চাচাত ভাই। তিনি জাঅ্‌ফর বিন কিলাব গোত্রের ‘আমের বিন সাঅ্সাঅ্ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরই বিশ্বাসঘাতকতার জন্যই বিঅরে মাউনার যুদ্ধে অধিকাংশ মুসলিম প্রাণত্যাগ করতে বাধ্য হন। তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেননি।

২. আব্বাস বিন মিরদাস আস্‌-সুলমী (৬৩৮খৃঃ)। তিনি আরবের বিখ্যাত নজ্‌দ প্রদেশের সুবিখ্যাত সুলাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা ছিলেন বিখ্যাত স্বাহাবী কবি আল-খানসা। তিনিও তাঁর মাতার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন المؤلفة قلوبهم এঁর একজন নামকরা স্বাহাবী এবং অন্যতম মুখাদ্বরিম কবি। ৬৩৮ খৃষ্টাব্দে কাদেসিয়ার যুদ্ধে তিনি তাঁর চার ভ্রাতার সঙ্গে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে শাহাদাত বরণ করেন মায়ের চোখের সামনে

৩.শাম্মাখ বিন দ্বেরার (৬৪০খৃঃ)। তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা মুখাদ্বরিম কবি। তিনি আরবের বিখ্যাত নজ্‌দ প্রদেশের সুবিখ্যাত ঘ্বাতফান বংশের ঝুবইয়ান শাখার সাঅ্‌দ গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মদীনা শরীফে ইসলাম গ্রহণ করেন।

৪. আবু ঝোয়ায়েব হুঝালী (৬৪৯খৃঃ)। তিনি আরবের হিজাজ প্রদেশের হুঝায়েল গোত্রের একজন নামকরা মুখাদ্বরিম কবি। তিনিপ্রাক-ইসলামী যুগে জন্মগ্রহণ করেন, এবং নবী (দঃ) এঁর সমীপে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের অভিপ্রায়ে মদিনাতে পৌঁছানোর দিন প্রত্যুষেই নবী (দঃ) ওফাত প্রাপ্ত হন। পরে অবশ্য তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পঞ্চ পুত্রের মৃত্যুতে শোকগাঁথা রচনা করে যশস্বী হয়েছেন।

৫. আবু মিহ্‌জান ছা‘কাফী (৬৫০খৃঃ)। তিনি ছিলেন আরবের বিখ্যাত ছা‘কীফ গোত্রের প্রসিদ্ধ কবি। তাঁর আসল নাম আম্‌র বিন হাবীব বিন আম্‌র। তাঁর ডাকনাম আবু মিহ্‌জান। ছা‘কীফ গোত্রে জন্মগ্রহণ করায় তাঁকে ছা‘কাফী বলা হয়। ৬৩১ খৃষ্টাব্দে তিনি তাঁর গোত্রের লোকেদের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন সৈনিক কবি (الفارس الشاعرى).

আরবি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা


আরবি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা

সাহিত্য চর্চায় রাসূল সা. ও সাহাবীদের ভূমিকা



বাংলায় আমরা যাকে সাহিত্য বলি, আরবিতে তা ‘আল-আদাব’। তবে ‘আদাব’ শব্দটি ‘সাহিত্য’ থেকে ব্যাপক অর্থবোধক। সাহিত্য বলতে যদি বুদ্ধিবৃত্তি ও আবেগ-অনুভূতির অভিব্যক্তি ঘটায় এমন শিল্পোৎকর্ষ চমৎকার কথামালা বুঝায়, তাহলে ‘আদাব’ দ্বারাও তা বুঝায়। তবে ‘আদাব’-এর মধ্যে অতিরিক্ত কিছু ভাবও রয়েছে। আর তা হলোঃ শিক্ষা, শিল্প, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ, নৈতিকতা ইত্যাদি। জাহিলী যুগের আরবি সাহিত্য ‘আদাব’ শব্দটির ব্যবহার দেখা যায় না। তেমনিভাবে আল-কুরআনেও শব্দটি নেই। তবে এ অর্থের ভিন্ন শব্দ পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহর (সাঃ) হাদিসে এর ব্যবহার দেখা যায়। যেমন, তাঁর অনুপম কথামালা, বাচনভঙ্গি, শব্দচয়ন, উন্নতমানের আচার-আচরণ, আদব-অভ্যাস, চাল-চলন ইত্যাদি দেখে সাহাবীরা অবাক বিস্ময়ে জানতে চাইলেন, আপনি এসব কোথা থেকে লাভ করেছেন? জবাবে তিনি বলেনঃ১  আমার রব, আমার প্রভু আমাকে এ আদব শিখিয়েছেন। সুতরাং তিনি আমাকে সুন্দরভাবেই শিখিয়েছেন। এখানে শব্দটি শিক্ষাদান অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আরেকটি বাণীতে এসেছেঃ ‘পৃথিবীতে এই কুরআন হলো আল্লাহর শিক্ষা ও সংস্কৃতির সমাবেশ স্থল। সুতরাং এ সমাবেশ স্থল থেকে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করো।’
হযরত ‘আলীর (রাঃ) একটি বাণীতে শব্দটির ব্যবহার এসেছেঃ ‘আমাদের বনু উমাইয়্যা ভাইয়েরা হলেন খাদ্য-খাবারের দিকে আহবানকারী।’ এখানে খাদ্য-খাবার সজ্জিত দস্তরখানের দিকে আহবানকারী বুঝানো হয়েছে।
শব্দটি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবীদের যুগে পরিচিত ছিল। তবে আধুনিক যুগে যে অর্থে শব্দটি ব্যবহার দেখা যায়, তখন এ অর্থে ব্যবহৃত হতো না। পরবর্তী দেড়শ’ বছর পর্যন্ত শব্দটির অর্থের বিবর্তন ঘটতে থাকে। হিজরী দ্বিতীয় শতকের পরবর্তী সময় থেকে শিক্ষা, শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি, উন্নত নৈতিকতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকে। আধুনিককালেও শব্দটি এসব অর্থে ব্যবহার হয়। তবে সাহাবীদের ভূমিকা হিসেবে ‘আদাব’ এখন সর্বজন স্বীকৃত পরিভাষা।
সাহিত্যচর্চায় সাহাবীদের ভূমিকা সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে ইসলাম-পূর্ব আরবের সাহিত্য ও সাহিত্যচর্চার অবস্থা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোচনা প্রয়োজন। সাহিত্যকে সাধারণভাবে দুভাগে ভাগ করা হয়। গদ্য ও পদ্য। ছন্দ ও অন্ত্যমিলের ভিত্তিতে বিন্যস্ত নয় এমন শিল্প-মান-সম্পন্ন কথাকে গদ্য বলে। আর যাতে ছন্দ ও অন্ত্যমিল থাকে তাকে পদ্য বলে। জহিলী যুগের আরবরা রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক কাজকর্মে লেখার ব্যবহার করেছে। আল-জাহিক বর্ণনা করেছেন যে, তারা তাদের রাজনৈতিক চুক্তিসমূহ লিখে রাখত। আর এই লিখিত চুক্তিসমূহকে তারা আল মাহরিক বলত। কবি আল-হারিছ ইবন হিল্লিযা (হি.পৃ. ২৪/খৃ. ৫৮০)-এর মু’আল্লাকায় এই ‘আল-মাহরিক’-এর উল্লেখ দেখা যায়। তবে কোনোভাবেই তারা এই গণ্ডির বাইরে নির্ভেজাল সাহিত্যচর্চার উদ্দেশ্যে আসেনি। সেই লেখা ছিল অতি সাধারণ ও সাদামাটা মানের। তাতে সুনির্দিষ্ট কিছু উদ্দেশ্য পূরণ হতো। আর পূরণ হবার পর তাদের লেখাও শেষ হয়ে যেত।৬ তবে তাদের জন্যে যতটুকু দাবি করা যায় তাহলো তাদের যথেষ্ট ‘আমছাল’ (প্রবাদ-প্রবচন) আছে। তারা এর যথেষ্ট প্রয়োগ করেছে। আর এর পাশাপাশি তাদের ছিল খুতবা (বক্তৃতা-ভাষণ) দানের রীতি। এ কারণে তাদের অনেক খুতবা ছিল। জাহিলী আরবের আমছালের একটি অংশ অবিকৃত গ্রন্থবন্ধ হয়েছে। আর তাদের খুতবা তার অল্পকিছু ছাড়া প্রায় সবই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। সাহিত্যের অপর শাখাটি পদ্য। পদ্য বা কাব্যের ক্ষেত্রে তাদের খ্যাতি ছিল বিশ্বব্যাপী।
অলঙ্কারমণ্ডিত ভাষা ও বাগ্মিতায় জাহিলী আরব যে অতি উঁচু স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল, আর কুরআনের বিভিন্ন স্থানে তার চিত্র পাওয়া যায়। যেমন আল্লাহ তা’আলা কাফিরদের পরিচয় দিতে গিয়ে এক স্থানে বলেছেনঃ ‘আর এমন কিছু লোক আছে যাদের পার্থিব জীবনের কথাবার্তা আপনাকে চমৎকৃত করবে। আর সে সাক্ষ্য স্থাপন করে আল্লাহকে নিজের মনের কথার ব্যাপারে। প্রকৃতপক্ষে সে কঠিন ঝগড়াটে লোক।’
আল কুরআনের আরও আয়াতে তাদের ঝগড়া, বিতর্ক ও বাকপটুতার চিত্র ফুটে উঠেছে। যেমনঃ ‘যদি তারা কথা বলে, আপনি তাদের কথা শুনুন।’ ‘অতঃপর যখন বিপদ কেটে যায় তখন তারা ধন-সম্পদ লাভের আশায় তোমাদের সাথে বাকচাতুরীতে অবতীর্ণ হয়।’১০ ‘তারা আপনার সামনে যে উদাহরণ উপস্থাপন করে তা কেবল বিতর্কের জন্যই করে। বস্তুত তারা হলো এক বিতর্ককারী সম্প্রদায়।’
আল্লাহ তা’আলা আল কুরআনের পরিচয় দিয়েছেন বর্ণনা, স্পষ্ট ও প্রাঞ্জল গ্রন্থ বলে। এতে সবকিছু বিস্তারিত বর্ণনা করে সুন্দরভাবে বুঝানো হয়েছে। এ কারণে এর নামকরণ করা হয়েছে ‘আল ফুরকান’। আল্লাহ এর ভাষাকে আরাবিয়ুম মুবিন বা স্পষ্ট আরবি বলে ঘোষণা করেছেন। সুতরাং এই আল কুরআনের মতো এত উন্নতমানের ভাষা ও বর্ণনাশৈলীর গ্রন্থ যে জাতির কাছে পাঠানো হয়েছিল, নিশ্চয় তারা এর ভাষার সমঝদার ছিল এবং তাদের ভাষা ও বর্ণনা ক্ষমতাও উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে গিয়েছিল। একথা আল-জাহিজ (মৃ. ২৫৫/৮৬৯) বলেছেন।১১ কথাশিল্প ও বাগ্মিতায় তাদের যে প্রচণ্ড দখল ছিল, তার আরো একটি প্রমাণ যে, আল কুরআনের মোকাবিলা করার জন্য তাদেরকে আহবান জানানো হয়েছে।১২ আর এটাও তাদের চূড়ান্ত পর্যায়ের বাগ্মিতা ও বর্ণনা ক্ষমতার প্রমাণ বহন করে। তেমনিভাবে শব্দ ও অর্থের মান ও গুরুত্বের পার্থক্য নিরূপণ এবং শব্দের ভাব-প্রকাশ ক্ষমতা কতটুকু তা যে তারা বুঝত, বিভিন্ন বর্ণনায় তারও প্রমাণ পাওয়া যায়। বর্ণিত আছে, আল-ওয়ালীদ ইবন আল-মুগীরা ইসলামের একজন প্রবল শত্রু ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মুখে আল-কুরআনের একটি আয়াতের তিলাওয়াত শুনে বলেছিলেনঃ১৩ 
‘আমি মুহাম্মদের নিকট কিছু কথা শুনেছি। তা না মানুষের কথা, না জ্বিনের। সে কথার আছে চমঃকার এক স্বাদ, আর তাতে আছে এমনই প্রাঞ্জলতা ও সৌন্দর্য, মনে হয় যেন এক ধরনের যাদু। তার উপরিভাগ যেমন ফলদায়ক, নিম্নভাগেও তেমনি প্রচুর পানীয়।’
আল-ওয়ালীদের এ মন্তব্য দ্বারা বুঝা যায়, অলষ্কারমণ্ডিত বিশুদ্ধ ভাষার তারা যেমন সমঝদার ছিল তেমনি সে ভাষায় তারা নিজেদের আবেগ-অনুভূতির প্রকাশ ও অভিব্যক্তিতেও সক্ষম ছিল।
বানু তামীমের একটি প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ও বক্তা আমর ইবন আল-আহ্‌তাম্মের ভাষণ শুনে তার বাকপটুতায় মুগ্ধ হয়ে রাসূল (সা) মন্তব্য করেনঃ১৪
‘নিশ্চয় কিছু কিছু বয়ান ও বাগ্মিতায় যাদু আছে।’
মোট কথা, প্রত্যেক জাতির কোনো না কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও স্বভাবগত গুণ থাকে। যখন সেই জাতির কথা কোথাও আলোচনা হয় তখন মুহূর্তের মধ্যে সেই গুণ-বৈশিষ্ট্যের প্রতি মানুষের মন চলে যায়। আরবদের সম্পর্কে যখন কোনো আলোচনা হয় তখন সর্বপ্রথম তাদের যে গুণ-বৈশিষ্ট্যের কথা মানুষের মনে জাগে তা হলো ভাষার জোর ও বাগ্মিতা শক্তি। প্রাচীন আরব জাতি অন্য অনারব জাতি-গোষ্ঠীর প্রতি ‘আল-আজম’ শব্দটি ব্যবহার করতো। এর দ্বারা তারা অনারবদেরকে বোবা অথবা মনের ভাব সুন্দরভাবে ব্যক্ত করতে অক্ষম বলে চিহৃত করতো।১৫ এ থেকে অনুমান করা যায়, তাদের নিকট বাগ্মিতার স্থান কি ছিল এবং তা নিয়ে তাদের ছিল কি পরিমাণ গর্ব ও অহংকার।
ইসলাম-পূর্ব আমলের আরবরা ছিল একটি কাব্য-রসিক জাতি। তাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে কবি ও কবিতার প্রভাব ছিল অপরিসীম। তাদের নিকট কবির স্থান ছিল সবার উপরে। তারা কবি ও নবীকে একই কাতারের মানুষ বলে মনে করতো। তাইতো তারা রাসূলুল্লাহকে (সা) কবি বলে আখ্যায়িত করেছিল। ইবন রাশীক আল-কায়রোয়ানী (মৃ. ৪৫৬/১০৬৪) জাহিলী আরবে কবির স্থান ও মর্যাদার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃ১৬ 
‘আরবের কোনো গোত্রে যখন কোনো কবি প্রতিষ্ঠা লাভ করতেন তখন অন্যান্য গোত্রের লোকেরা এসে সেই গোত্রকে অভিনন্দন জানাতো। নানারকম খাদ্যদ্রব্য তৈরি করা হতো। বিয়ের অনুষ্ঠানের মতো মেয়েরা সমবেত হয়ে বাদ্য বাজাতো। পুরুষ ও শিশু-কিশোররা এসে আনন্দ প্রকাশ করতো। এর কারণ, কবি তাদের মান-মর্যাদার রক্ষক, বংশের প্রতিরোধক এবং নাম ও খ্যাতির প্রচারক।’
প্রাচীন আরবি সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করলে দেখা যায়, জাহিলী আরবে যেন কাব্যচর্চার প্লাবন বয়ে বলেছে। অসংখ্য কবির নাম পাওয়া যায় যা শুনেও শেষ করা যাবে না। ইবন কুতায়বা (মৃ. ২৭৬/৮৮৯) বলেছেঃ১৭ 
‘কবিরা- যারা কবিতার জন্যে তাদের সমাজে ও গোত্রে জাহিলী ও ইসলামী আমলে প্রসিদ্ধি অর্জন করেছেন তাদের সংখ্যা এত বেশি যে কেউ তা শুমার করতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেছেঃ
‘যারা কবিতা বলেনি- তাদের সংখ্যা খুবই কম। তাদের নাম যদি আমরা উল্লেখ করতে চাই তাহলে অধিকাংশ লোকের নাম উল্লেখ করতে পারবো।’
রাসুলুল্লাহর (সা) খাদেম প্রখ্যাত সাহাবী হযরত আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন:
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন আমাদের এখানে (মাদিনা) আসেন তখন আনসারদের প্রতিটি গৃহে কবিতা বলা হতো।’
আরবদের ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতির এমনি এক পর্যায়ে ইসলামের অভ্যুদয় ঘটে এবং আর কুরআন অবতীর্ণ হয়। পূর্ববর্তী আলোচনায় দেখা গেছে, তখন আরবি সাহিত্যের গদ্য ও পদ্য উভয় শাখায় ব্যাপক চর্চা হচ্ছিল। গদ্যের কোনো লিখিত রূপ না থাকলেও মৌখিক গদ্য তথা খুতবা (বৃক্তৃতা-ভাষণ) যথেষ্ট উন্নতি লাভ করে এবং গোটা আরবে এর ব্যাপক চর্চা হতে থাকে। জাহিলী যুগের যে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ইসলাম নতুনত্ব আনে তার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো কবিতা ও খুতবা। এ দুটি জাহিলী যুগেরই শিল্প। ইসলাম তা বহাল রেখে তার আরও উন্নতি ও ব্যপ্তি ঘটায়। এ যুগে দাওয়াতী কার্যক্রম, বিজয় অভিযান, যুদ্ধ-বিগ্রহ প্রভৃতিতে মুসলমাদের খুতবার বেশি প্রয়োজন থাকায় উন্নতির ক্ষেত্রে খুতবা কবিতাকে ডিঙিয়ে যায়। খুতবা তাদের নিকট বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিল। কারণ খুতবার প্রতি মানুষ বিরূপ হয়ে উঠতে পারে আল কুরআনে তেমন কোনো কথা আসেনি, যেমন এসেছে কবিতা ও কবিদের সম্পর্কে।১৮ জাহিলী যুগের লোকদের অতিমাত্রায় কবিতার প্রয়োজন থাকায় কবিকে খতীবের (বক্তা) ওপর গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিত। কিন্তু ইসলামী যুগে দাওয়াতী কাজের জন্যে, ব্যক্তি-সাহসকে জাগিয়ে তোলার জন্যে, বিভিন্ন দল ও মতের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্যে এবং শত্রুকে ভয় দেখানো ও বিতাড়নের জন্যে খুতবার বেশি প্রয়োজন হওয়ায় তাদের নিকট কবির চেয়ে খতীবের মর্যাদা বেড়ে যায়।১৯ সুতরাং এটা স্বাভাবিক যে, জাহিলী যুগের তুলনায় ইসলামী যুগে খুতবা শুধু উৎকর্ষই হয়নি, বরং তা নতুন পথও পেয়ে যায়। ইসলাম খুতবার গুরুত্ব বাড়ানোর সাথে সাথে বিষয়বস্তু ও রীতি পদ্ধতিতেও নতুনত্ব আনে।
এর সাথে এ সত্যও স্বীকৃত যে, সকল চিন্তা ও ধর্মীয় আন্দোলন সব সময় খুতবার কাছে ঋণীই থেকে গেছে। বক্তাসুলভ বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জলভাষী দাঈ (আহবানকারী) চিন্তা ও ধর্মের জগতে মাথার মুকুট হয়ে রয়েছেন। সকল নবী-রাসূল এবং সততা ও সত্যের দিকে সকল আহবানকারী নিজ নিজ মানুষের মান-মস্তিষ্ক প্রভাবিত করণের এবং সত্যের আওয়াজকে তাদের হৃদয়ের গভীরে পৌঁছানোর জন্যে সর্বদাই খুতবা ও বয়ানের প্রয়োগ করেছেন।
ওয়াজ-নসীহত ও উপদেশমূলক সাপ্তাহিক ও বাৎসরিক তথা জুম’আ, ঈদ ও হজ্জের খুতবা ছাড়াও এ যুগে অন্য যে সকল খুতবা আত্মপ্রকাশ করে তার মধ্যে জিহাদের খুতবা, বাহাছ-মুনাজারার খুতবা, বিজয়ের খুতবা এবং শোকজ্ঞাপক খুতবা বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক খুতবা, প্রতিনিধি মিশনের খুতবা ছাড়াও আরও এক প্রকার অতি গুরুত্বপূর্ণ খুতবার আত্মপ্রকাশ ঘটে এ যুগে, যাকে খিলাফত ও বিলায়ত-এর খুতবা নামে অভিহিত করা হয়। এটি হলো খলীফা নির্বাচনের পর জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত তাঁর প্রথম নীতি-নির্ধারণী ভাষণ। কোনো প্রাদেশিক শাসনকর্তার ভাষণও এর অন্তর্ভুক্ত।
ইসলামী যুগের খতীবদের (বক্তা) সংখ্যা এত বেশি যে, খুতবার ইতিহাসের অন্য কোনো যুগের আধিক্যের সাথে তুলনীয় নয়। এ সকল খতীবের ইমাম হলেন সায়্যিদুল মুতাকাল্লিমীন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সা)। কিয়ামতের দিনও তিনি হবেন আম্বিয়ায়ে কিরামের খতীব।২০ তিনি ছিলেন একজন বিশুদ্ধভাষী মানুষ। তাঁর ভাষার শুদ্ধতা ও সাবলীলতায় বিস্মিত হয়ে সাহাবীগণ প্রশ্ন কর তেন: আপনিএ ভাষা ও বর্ণনা জ্ঞান বিভাবে অর্জন করলেন? জবাবে রসূল (সা) বলতেন: আমি কুরায়েশ বংশে জন্মগ্রহণ করেছি এবং বানু সাঈদে লালিত পালিত হয়েছি। তাঁর ভাষা জ্ঞান এত প্রখর ছিল যে, কোথায় এবং কখন কিরূপ শব্দ ব্যবহার করা উচিত এবং উচিত নয় তাও বলে দিতেন। তাঁর পরের স্থানে হলেন খতীবদের বিরাট একটি দল। তাদের মধ্যে প্রথম হলেন আলী ইবন আবী তালিব (রা)। তারপর আবু কবর, উমার ও উসমানের (রা) নামগুলো আসে। আবুল হাসান আ-মাদাইনী বলেন:২১ 
‘আবু বকর খতীব ছিলেন, উমার খতীব ছিলেন এবং উসমানও খতীব ছিলেন, আলী ছিলেন তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ খতীব।’ এভাবে এ যুগে অসংখ্য তুখোড় খতীবের নাম ও তাদের খুতবা আরবি সাহিত্যের প্রাচীন সংকলনসমূহে দেখা যায়। পুরুষ খতীবদের পাশাপাশি অসংখ্য মহিলা খতীবের নামও পাওয়া যায়। যেমন উম্মুল মুমিনীন আইশা (রা), উম্মুল খায়র আল-বারকিয়্যা, আয-যারকা বিন্‌ত হাদী, ইকরাশা বিন্‌ত আল-আতরাশ (রা) ও আরও অনেকে বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, জাহিলী যুগে কোনো লিখিত গদ্য ছিল না। ইসলামী যুগে শিক্ষার প্রসার হওয়ার এবং প্রয়োজনের তাগিদে পত্র-সাহিত্যের চর্চা শুরু হয়। এ পত্র-সাহিত্যের সূচনা করেন রাসূল (সা)। পরবর্তীকালে খলীফাগণ, প্রাদেশিক শাসকর্তা ও সেনাবাহিনীর কমান্তারগণ নানা ধরনের পত্রের আদান-প্রদান করেছেন, এসব পত্রেরও একটা সাহিত্য মান ও মূল্য আছে।
কবিতা ছিল জাহিলী আরববাসীর ভূষণ। সে যুগে আরবি কবিতার চরম উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। ইসলামী যুগেও এ ধারা অব্যাহত থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা) নিজে কবি ছিলেন না। তবে তিনি কবিতা শুনেছেন, আবৃত্তি করেছেন কবিদেরকে উৎসাহ এবং মর্যাদা দিয়েছেন। তিনি একটি সুন্দর কবিতার আবৃত্তি শুনে মন্তব্য করেনঃ ‘কোনো কোনো বাগ্মীতায় যাদু রয়েছে। আর কোনো কবিতায় রয়েছে জ্ঞান বা হিমাতের কথা। একদা শারীদ ছাকাফী রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বাহনের পেছনে আরোহী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাঁর কাছে উমিয়্যার কবিতা শুনতে চাইলেন। তিনি আবৃত্তি করছিলেন, আর রাসূলুল্লাহ (সা) তাকেঁ আরও শোনাতে বলছিলেন। তিনি সেদিন মোট একশ’টি শ্লোক শুনেছিলেন। এ কথা সকলের জানা, কুরায়শদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরাত করেন। এরপরই এ শহরের অধিবাসীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। একদিকে ছিল মক্কার কুরায়শ ও তাদের সহযোগী অন্যান্য আরব গোত্র। আর অপর দিকে ছিলেন নির্যাতিত রাসূল (সা) ও মদিনার আনসার ও মুনসার এবং মহাজিরগণ। এ যুদ্ধের অস্ত্রধারী যোদ্ধাদের পাশাপাশি উভয় পক্ষের কবিরা কবিতার যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।
ইসলামী-পূর্ব যুগে কুরায়শ গোত্রের উল্লেখযোগ্য কোনো কবি না থাকলেও ইসলামের সাথে সংঘর্ষের যুগে তাদের মধ্যে আবু সুফিয়ান, আবদুল্লাহ ইবন আয-যিবা’রী, দারার ইবন খাত্তাব আল ফিহরী, আবু ইজ্জাহ আল-জামহী হুবায়রাহ মাখযুমী প্রমুখ কবি প্রতিভাব প্রকাশ ঘটে। তারা সকলে ইসলাম-বিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। তারা তাদের কবিতার দ্বারা রাসূলুল্লাহ (সা), আনসার ও মুহাজিরদের গোত্র, ব্যক্তি চরিত্র ও ইসলামের নিন্দা ও কুৎসা বর্ণনা করতে থাকে। এটা মদিনাবাসীদের জন্যে কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মুসলমানদের কুৎসা রচনা করতো শুধু এ কারণে নয়; তারা তাদের রচিত দ্বারা অন্যন্য গোত্রে ইসলামের প্রচার কার্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতো, এ জন্যেও। একদিন অতিষ্ঠ হয়ে রাসূলুল্লাহ (সা) মদিনার আনসারদেরকে লক্ষ্য করে বলেন: ‘যারা হাতিয়ার দ্বারা আল্লাহ ও তার রাসূলকে সাহায্য করছে, জিহবা দ্বারা সাহায্য করতে কে তাদেরকে বাধা দিয়েছে?’ এ কথা শুনে হাসসান ইবনে ছাবিত বলেন: আমি এর জন্যে প্রস্তুত। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেন, আমিও তো কুরাইশ বংশের। তুমি কিভাবে তাদের নিন্দা করবে? উত্তরে তিনি বলেন, ‘মথিত আটা থেকে চুল যেভাবে বের করে আনা হয় আমিও তদ্রুপ আপনাকে বের করে আনবো।’ তার জন্যে মসজিদে নববীতে একটি মিম্বর স্থাপন করা হয়। তিনি সেখানে দাঁড়িয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃতি করতেন। রাসূলুল্লাহ (সা) তার কবিতা শুনে বলতেন, ‘আমার পক্ষ থেকে জবাব দাও। হে আল্লাহ রুহুল কুদ্দুসকে দিয়ে তার সাহায্য করো।’ আর রাসূল (সা) তাকে এ কথাও বলেন যে, তুমি আবু বকরের নিকট গিয়ে কুরায়শেদের দোষ-ত্রুটি ও দুর্বল দিকগুলি জেনে নাও। এ সম্পর্কে আবু বকরই অধিক জ্ঞানী। সত্যিই সেদিন হাসসান এ কাজের উপযুক্ত ছিলেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে এ ক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছিলেন, ‘তার এ কবিতা তাদের জন্যে তীরের আঘাতের চেয়েও তীব্রতার।’ এসব কারণেই তিনি সঙ্গতভাবেই ‘শাইরুর রাসূল’ বা রাসূলের কবি নামে খ্যাতি লাভ করেছেন। এ ‘কবিতার সংর্ঘষে অপর যে দু’জন কবি তাকে সাহায্য করেন, তারা হলেন, কাব ইবন মালিক ও আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা। সীরাতে ইবনে হিশাম পাঠ করলে কবিতার ও লড়াইয়ের একটা চিত্র দেখতে পাওয়া যায়।
ইসলামী সাহিত্যের ইতিহাসে কবি কা’ব ইবন যুহায়রের ঘটনাটি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। ইসলাম শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি যে কত উদার ও এর কত বড় পৃষ্ঠপোষক’ এ ঘটনা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। জাহেলী ও ইসলামী যুগের বিশিষ্ট কবি কাব ইবন যুহায়র। তিনি ইসলাম গ্রহণের পূর্বে ইসলাম ও ইসলামের নবীর নিন্দামূলক কবিতা রচনা করে রাসূলের বিরাগবাজন হন। রাসূল (সা) তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। সে ব্যক্তিই যখন ইসলাম গ্রহণ করে মদিনায় এলেন এবং তার বিখ্যাত কাসিদা ‘বানত ‘বানত সূ’আদ’ আবৃত্তি করে রাসূলকে (সা) শোনান, তখন রাসূল (সা) তাকে শুধু ক্ষমাই করেননি; বরং খুশির আতিশয্যে তার সৃষ্টির প্রতিদান স্বরূপ নিজ দেহের চাদরটি তাকে উপহার দনে।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নির্দেশে নাদর ইবন হারিজকে হত্যা করা হয়। এরপর তার কন্যা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সমীপে উপস্থিত হয়ে একটি মর্মস্পর্শী কবিতা আবৃত্তি করে। তা শুনে, তিনি বলেন, ‘যদি এ কবিতা নাদরের হত্যার পূর্বে শুনতাম তাহলে তাকে হত্যা করতাম না।’ তুফায়ল ইবন আমর আদ-দাওসী রাসূলুল্লাহ (সা) এর খেদমতে উপস্থিত হয়ে ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন এবং বলেন: আমি একজন কবি, আমার কিছু কবিতা শুনুন। রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে তার কবিতা আবৃত্তি করতে বলেন। অতঃপর তিনি একটি দীর্ঘ কবিতা পাঠ করেন এবং রাসুলুল্লাহ (সা) ধৈর্যসহকারে তা শোনেন। কবিতার জ্ঞানে রাসূল (সা) ছিলেন পারদর্শী। তিনি অনেক কবির কবিতা সংশোধন করে দিয়েছেন।
রাসূলুল্লাহর (সা) ইনতিকালের পর তাঁর সুযোগ্য খলীফাগণ ইসলামী রাষ্ট্রের পরিচালনার ভার গ্রহণ করেন। এ যুগেও কবিতাচর্চায় তেমন ভাটা পড়েনি। খুলাফায়ে রাশিদীন সর্বদাই কবিতা আবৃত্তি করতেন। আর রাসূলুল্লাহর (সা) সাহাবীরা তো মসজিদে নববীতে কবিতা আবৃত্তির আসর বসাতেন।২২ ইসলামী যুগে যে সকল যুদ্ধ-বিগ্রহ হয় তাতে উভয় পক্ষে অসংখ্য কবি অংশগ্রহণ করেন এবং নিজ নিজ পক্ষের শৌর্য-বীর্যের বর্ণনা ও শত্রুর উদ্দেশ্যে নিন্দামূলক কবিতা রচনা করেন। খুলাফায়ে রাশিদীনের প্রত্যেকে কবি ছিলেন। সা’ঈদ ইবন আল-মুসায়্যিব বলেন:২৩
‘আবু বকর (রা) কবি ছিলেন। উমার (রা) কবি ছিলেন। আর ‘আলী (রা) ছিলেন তিনজনের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কবি।’ সে যুগের সমালোচনা সাহিত্যের ইতিহাস পাঠ করলে হযরত আবু বকরকে (রা) একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্য সমালোচক রূপে দেখতে পাওয়া যায়। তিনি কবি নাবিগা আয-যুবইয়ানীকে জাহিলী যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মনে করতেন এবং বলতেন: তার কবিতা শিল্পকুশলতা ও ছন্দ মাধুর্যে সর্বোৎকৃষ্ট এবং সর্বাপেক্ষা বেশি সাবলীল।২৪ দ্বিতীয় খলীফা উমার (রা) সম্পর্কে তো প্রসিদ্ধি আছে, কোনো প্রতিনিধিদল তার কাছে এলে তিনি তাদের কবিদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতেন। তারা তাদের কবিদের কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতো এবং তিনি নিজেও কোনো কোনো সময় সেসব কবিতার কিছু অংশ আবৃত্তি করতেন। তিনি বসরার শানকর্তা আবু মূসা আল-আশ’আরীকে (রা) নির্দেশ দেন:
‘তুমি তোমার ওখানকার লোকদেরকে কবিতা শেখার নির্দেশ দাও। কারণ, কবিতার মাধ্যমে উন্নত নৈতিকতা, সঠিক সিদ্ধান্ত এবং বংশ এস্পর্কে জ্ঞান লাভ করা যায়।’ তিনি আরও বলতেন:২৫ ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সাঁতার ও তীর চালনা শেখাও। তাদেরকে ঘোড়ার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দাও। আর তাদেরকে সুন্দর কবিতা বলে শোনাও।’ ইবন সাল্লাম আল-জুমাহী (মৃ.হি.২৩২) বলেন, ‘তিনি যে কোনো ধরনের ঘটনা বা ব্যাপারের সম্মুখীন হলেই সে সম্পর্কে কবিতার দু’একটি পংক্তির উদ্ধৃতি দিতেন।’২৬ আরবি সাহিত্য সমালোচনার ইতিহাসে তাকে সে যুগের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য-সমালোচক গণ্য করা হয়েছে। তিনি প্রথম ব্যক্তি যিনি রুচির ভিত্তিতে নয়, বরং যুক্তির ভিত্তিতে সমালোচনা করেছেন, কবি যুহায়রকে তিনি সে যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি মনে করতেন। শুধু এ সিদ্ধান্ত দিয়েই ক্ষান্ত হননি, সঙ্গে তার কারণও বলে দিয়েছেন। যুহায়রকে তিনি বলতেন:২৭ তিনি এক কথার মধ্যে আরেক কথা গুলিয়ে ফেলতেন না। জংলি ও আশোভন কথাও এড়িয়ে চলতেন। কোনো ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান গুণেরই তিনি প্রশংসা করেছেন। তার কবিতায় কোনো অতিরঞ্জন নেই। তাই তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি।’ তিনি এবং তার সঙ্গীসাথীরা সমবেত হয়ে কবিতা ও কবিদের সম্পর্কে আলোচনা করতেন এবং কার কোন কবিতা সর্বোৎকৃষ্ট সে সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করতেন।২৮ তিনি বলতেন, কবিতা হলো কোনো জাতির এমনই এক জ্ঞান যার চেয়ে শ্রেষ্ঠ আর কোনো জ্ঞান নেই। (আল উমদা: ১-৯)
উমার (রা) কুরআনের আয়াতের অর্থ বুঝতে কবিতার শরণাপন্ন হতেন। একবার তিনি মিম্বরে ওপর দাঁড়িয়ে সূরা আন-নাহলের ৪৭তম আয়াত পাঠ করেন। তারপর উপস্থিত সাহারায়ে কিরামের নিকট আয়াতে উল্লেখিত তাকাউয়ুফিন শব্দটির অর্থ জানতে চান। সাহাবায়ে কিরাম সকলে চুপ থাকলেন। তখন হুযায়ন গোত্রের এক বৃদ্ধ উঠে দাঁড়িয়ে বলল: হে আমীরুল মু’মিনীন! এটা আমাদের উপভাষা। এর অর্থ অল্প-অল্প নেওয়া। ‘উমার (রা) বৃদ্ধের নিকট জানতে চাইলেন, আরবরা কি তাদরে কবিতা থেকে অর্থ জানতে পারে? অথ্যাৎ আরব কবিরা তাদের কবিতায় এ অর্থে শব্দটি প্রয়োগ করেছেন? বৃদ্ধ বললেন, হ্যাঁ আমাদের কবি আবু কাবীর আল-হুযালী তার উষ্ট্রীর বর্ণনা দিতে গিয়ে একটি শ্লোকে এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। তারপর বৃদ্ধ শ্লোকটি আবৃত্তি করে শোনান। ‘উমার (রা) তখন বলেনঃ ‘তোমরা তোমাদের দীওয়ান সংরক্ষণ করে রাখো, তাহলে তোমরা আর গোমরাহ্‌ হবে না।২৯ ইসলামের চতুর্থ খলীফা আলী (রা) ছিলেন জ্ঞানের ভাণ্ডার। সে যুগের আরব কবিদের মধ্যে তিনিও একজন শ্রেষ্ঠ কবি। ‘দিওয়ানে আলী, নামক কাব্য সংকলন গ্রন্থটি আজও তার কাব্য প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে চলেছে। আরবি ভাষা ও সাহিত্যের উন্নতি ও উৎকর্ষ সাধনে তার অবদান এ ভাষা যতদিন বেঁচে থাকবে, মানুষের নিকট স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ছিলেন আরবি সাহিত্যের একজন সমঝদার সমালোচক। কেবলমাত্র সাহিত্যিক-সৌন্দর্য ও ভাষার অভিনবত্বের কারণে তিনি জাহিলী যুগের ভোগবাদী কবি ইমরুল কায়সকে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে করতেন।৩০ একবার যিয়াদ তার এক ছেলেকে আমীর মু‘আবিয়ার (রা) নিকট পাঠালেন। মু‘আবিয়া তার জ্ঞান-গরীমা পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তাকে অনেক প্রশ্ন করলেন। দেখলেন, ছেলেটির সব বিষয়ে যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি আছে। সবশেষে তিনি তাকে কিছু কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতে বলেন। এবার ছেলেটি অক্ষমতা প্রকাশ করল। তখন মু‘আবিয়া (রা) যিয়াদকে লিখলেন : তুমি তোমার ছেলেকে কবিতা শেখাওনি কেন? কবিতা শিখলে সে অবাধ্য থাকলে বাধ্য হবে, কৃপণ তাকলে দাতা হবে এবং ভীরু থাকলে সাহসী হয়ে যুদ্ধে যাবে।৩১ রাসূলুল্লাহর (সা) খলীফাগণ ছাড়াও অন্যান্য সাহাবীরা কবিতা চর্চা করতেন। নিজেরা কবিতা শিখতেন এবং অন্যদেরকে শেখার নির্দেশ দিতেন। হযরত আইশা (রা) বলেন: ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে কবিতা শিক্ষা দেবে। এতে তাদের ভাষার আড়ষ্টতা দূর হয়ে সহজ সাবলীল হবে।’৩২ তার অসংখ্য কবিতা মুখস্থ ছিল এবং বিভিন্ন প্রসঙ্গে আবৃত্তি করতেন। এমন কি রাসূলুল্লাহ (সা) সাহাবীদের এমন কাউকেও পাওয়া মুমকিল যিনি কোনো কবিতা রচনা করেননি, অথবা কখনো কবিতা আবৃত্তি করেননি।’৩৩ হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস বলতেন, পবিত্র কুরআন পাঠ করে যদি কোথাও বুঝতে না পারো তাহলে তার অর্থ আরবদের কবিতার মাঝে সন্ধান করো।৩৪ এভাবে যদি সে যুগের আরবি সাহিত্যের ইতিহাস পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে সাহিত্যে চর্চার ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কিরাম ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। মূলত সাহাবায়ে কিরামের দুই আদর্শ ছিল আল কুরআন ও রাসূলুল্লাহ (সা) সুন্নাহ। এ দু’টির ভিত্তিতে যেমন তারা জীবন পরিচালনা করেছেন, তেমনিভাবে এ দুটির আলোকে তারা সাহিত্য চর্চাও করেছেন। তাদের সার্বিক সর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে সাহিত্যচর্চার ব্যাপারে কোথাও তাদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি লক্ষ্য করা যায় না। বরং ব্যপকভাবে তারা এ কাজে অংশগ্রহণ করেছেন।
তথ্য সূত্র
১. আহমাদ শায়িব, উসূল আন-নাকদ আ-আদাবী, পৃ.৪
২. ইবনুল আছীর, আন-নিহায়া, (আদব)
৩. প্রাগুক্ত
৪. আল-জাহিজ, কিতাবুল হাওয়ান, ১/৬৯
৫. দিওয়ানু শি‘র আল-হারিছ ইবন হিল্লীযা, পৃ.২০
৬. মাসাদির আশ-শি‘র আল-জাহিলী, পৃ. ২৩-৫৮
৭. আল কুরআন, ২:২০৪
৮. প্রগুক্ত, ৬৩:৪
৯. প্রগুক্ত, ৩৩:১৯
১০. প্রাগুক্ত, ৪৩:৫৮
১১. আল-জাহিজ, আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ১/৮
১২. আল কুরআন, ১০:৩৮; ১১:১৩; ১৭:৮৮
১৩. আস-যামাখশারী, আল-কাশশাফ, ৪/৬৪৯; ড. শাওকী দায়ফ, আল-বালাগা: তাতাওর তারীখ, পৃ. ৯; মুহাম্মাদ ‘আলী আস-সাবুনী, আত-তিবয়ান ফী ‘উলূম আল কুরআন, ১০২,১০৩
১৪. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ১/৫৩ ৩৪৯; আবু ইসহাক আল-হাসারী, সাহরুল আদাব, ১/৫
১৫. আল-বায়ান, ৪/২৭; ড. জহুর আহমাদ আজহার, ফাসাহাতে নাবাবী, পৃ. ৯৮
১৬. ইবন রাশীক, কিতাবুল উমদা, ১/৭৮
১৭. ইবন কুতায়বা, আশ-শি‘রু ওয়াশ-শু‘আরা; পৃ. ৩
১৮. আল কুরআন, ২৬:২২৪
১৯. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ২/৯৮; জুরজী যায়দান, তারীখু আদাব আল-লুগাহ্‌ আল-‘আরাবিয়্যাহ, ১/১৮৭
২০. মুসনাদে আহমাদ, ৫/১৩৭-১৩৮
২১. আল-বায়ান ওয়াত তাবয়ীন, ১/৩৫৩
২২. ড. শাওকী দায়ফ, তারীখ আল-আদাব, ২/৪৫
২৩. ইবন ‘আবদি বাব্বিহি, আল-‘ইকদ আল-ফারীদ, ৫/২৮৩
২৪. ড. ‘আবদুল মুনইম খাফাজী, মুকদ্দিমা: নাকদ আশ-শি‘র, পৃ. ২৩
২৫. আ-‘উমদা, ১/১০; হুসন আস-সাহাব, ১০/২২
২৬.আল-‘আকদ আল-ফারদী, ৫/২৮১
২৭. ইবন সাল্লাম আল-জুমাহী, তাবাকাত আশ-শূ‘আরা’ পৃ. ২৯; আল-বাকিল্লানী, ই’জাস আল কুরআন, পৃ.১৩৪
২৮. মুকদ্দিমা: নাকদ আশ-শি‘র, পৃ. ২৩
২৯. ইবন মানসুর, লিসান আ-‘আরাব-২/১৯৯২; তাজ আল-‘আরূস, ৬/১০৬
৩০. মুকাদ্দিমা : নাকদ আশ-শি‘র, পৃ. ২৩
৩১. আল-ইকদ আল-ফারীদ, ৫/২৭৪
৩২. প্রাগুক্ত ৫/২৭৪. ৬/৭
৩৩. প্রাগুক্ত-৫/২৮৩; জুরজী যায়দান-১/১৯২
৩৪. জুরজী যায়দান-১৯২

প্রাক-ইসলামী যুগ ( ৫০০-৬২২ খৃষ্টাব্দ) সাহিত্যিকগণ


প্রাক-ইসলামী যুগ ( ৫০০-৬২২ খৃষ্টাব্দ)


১.  আশ-শানফারা(৫১০খৃঃ)। প্রাচীন আরবের বেদুঈন কবিদের অন্যতম। তিনি দক্ষিণ আরবের ইয়ামেন প্রদেশের বিখ্যাত আযদগোত্রের বনু আওয়াস ইবনে হুজর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম ছাবেত ইবনে আউস আল আয়াদী। কিন্তু তাঁর কৃষ্ণ চর্ম, পুরু ঠোঁট, আর বেশী বাচালতার জন্য তিনি শানফারা নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। শানফারার সেরা কাব্যকীর্তি তাঁর ‘লামিয়াতুল আরব’। এটি আরবী কবিতাবলীর উৎকৃষ্ট নিদর্শন।

২. তাআব্বাতা শাররান(৫৩০খৃঃ)। তিনি ছিলেন শানফারার সমসাময়িক কবি আর স্বভাবে তাঁরই দোসর। তাঁর জন্ম হয় আরবের তেহামা প্রদেশের কায়েস গোত্রের ফাহ্‌ম পরিবারে। তাঁর প্রকৃত নাম ছাবেত ইবনে জাবের ইবনে আবু সুফিয়ান। কিন্তু তিনি তাআব্বাতা শাররান নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি ছিলেন আরবদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা সূক্ষ্ম শ্রবন শক্তি সম্পন্ন, সর্বাপেক্ষা অধিক দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ও সর্বাপেক্ষা গভীর চক্রান্তকারী ব্যক্তি।

৩. মুহাল্‌হিল বিন রাবিয়াহ (৫৩১খৃঃ)। যে মহাপ্রাণ মনিষীকে নিয়ে আরবী সাহিত্যের সূচনা, তিনি হলেন আরবী কাব্যজগতের প্রথম ‘কাসীদা রচয়িতা মুহালহিল। তাঁর জন্ম হয় আরবের নজদ প্রদেশের তাঘলিব গোত্রে। তাঁর প্রকৃত নাম আবু লায়লা ‘আদী ইবনে রাবী’আ। তাঁর কবিতাকে কেন্দ্র করেই বনু বাক্‌র ও বনু তাঘলিব গোত্রের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘বাসুস’ যুদ্ধের সূত্রপাত হয়। নারী ঘেঁসা স্বভাবের জন্য তাঁর ভ্রাতা কুলাইব তাঁকেزير النساء  তথা ‘নারী সহচর’ বলে ডাকতেন।

৪. জালীলা বিনতে মুর্‌রা (৫৩৮খৃঃ)। প্রাচীন যুগের মহিলা কবিদের পথিকৃৎ হলেন জালীলা বিনতে মুররা। আরবের বিখ্যাত বাকরগোত্রের বনু শায়বান পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আদি কবি মুহালহিলের ভ্রাতা কুলায়েবের পত্নী ও তাঁর হন্তা জাসসাসের ভগ্নী।
  هى أخت جساس الشيبانى   قاتل كليب بن ربيعة وهى ايضا زوجة كليب المقتول- جرجى زيدان’ تاريخ’ ج ١’ ص     ١٤٩ 



     তাঁর প্রথম কবিতা ছিল শোকগাথা মূলক কবিতা যা তিনি তাঁর ভ্রাতা কুলায়েবের মৃত্যুতে রচনা করেন।

৫. ইমরু’উল ‘কায়েস(৪৮০-৫৪০খৃঃ)। মু‘আল্লা‘কা রচয়িতা কবিকূলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা অধিক খ্যাতিমান কবি আবুল হারিছ ইমরু’উল ‘কায়েস বিন হুজর আল-কিন্দী। তিনি আরবের নজ্‌দ প্রদেশের ইয়ামেনি রাজবংশের কিন্দা গোত্রে ৪৮০ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। পিতামহের নাম হারিছ। মাতার নাম ফাতিমা। আর দুই মাতুলের নাম ছিল কুলায়েব ও মুহালহিল। কিশোর বয়স হতেই তিনি যাযাবরদের মত ঘুরে বেড়াতেন বলে তাঁকে ‘ভবঘুরে কুমার’(الملك الضليل) বলা হয়।هو أشهر الشعراء الجاهلية واشرافهم اصلا ورافعهم منزلة- جرجى زيدان’ تاريخ اداب اللعة العربية ’ ج ١’ ص ١٠٠

৬. ‘আবীদ ইবনুল আবরাস্ব (৫৫৫খৃঃ)। মু‘আল্লা‘কা কবিকূলের পর যে কয়েকজন কবি প্রাচীন আরবে অধিকতর প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সক্ষম হয়েছেন কবি ‘আবীদ ইবনুল আবরাস্ব তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি আরবের নজদ প্রদেশের বিখ্যাত আসাদ গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি প্রথম জীবনে ইমরু’উল ‘কায়েসের পিতা হুজরের প্রিয় সভাসদ ছিলেন। হীরা রাজ আল-মুনঝিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রার্থী হওয়ায় তাঁকে নিষ্ঠুর ভাবে নিহত হতে হয়।

৭. ত্বারাফা ইবনে আল-‘আব্‌দ ইবনে মালিক আল-বাকরী (৫৪০-৫৬৪খৃঃ)। তাঁর জনক ‘আবদ ও জননী ওয়ারদা উভয়েই বিখ্যাত মা‘আদ গোত্রীয় ব্যক্তি। তিনি পারস্য উপসাগরীয় দ্বীপ আল্‌-বাহরাইনের বাকর গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন হিরার নরপতি ‘আমর বিন হিন্দের সমসাময়িক কবি। তাঁর প্রেমিকের নাম খাওলা। তিনি ছিলেন সৈনিক কবি ও ব্যঙ্গ কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত। ব্যঙ্গ কবিতা রচনার ক্ষেত্রে মহাকবি ইমরু’উল ‘কায়েসও তাঁর সমকক্ষ হতে পারেনা। হিরার নরপতি ‘আমর বিন হিন্দের ভগ্নীর রুপ-সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে তিনি কবিতা রচনা করার কারণে রাজা তাঁকে কৌশলে হত্যা করেন।

৮. খিরনিক বিনতে বদর ইবনে হাফফান (৫৭০খৃঃ)। যে সমস্ত মহিলা নিজেদের প্রতিভা ও অনুশীলনের মাধ্যমে প্রাচীন আরবে সাহিত্যের ক্ষেত্রে পুরুষদের পাশে স্থান ক’রে নিতে সক্ষম হয়েছিলেন খিরনিক তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি কবি ত্বরাফার বৈপিত্রেয় ভগ্নী। তিনি শোকগাথা মূলক কবিতা রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন।

৯. ‘হারিছ বিন হিল্লিযা (৫৮০খৃঃ)। যে সমস্ত মানব প্রতিবন্ধী হওয়া সত্বেও নিজ প্রতিভাবলে দেশবরেণ্য ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন কবি ‘হারিছ বিন হিল্লিযা তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। আবূ যালিম আল-হারিছ ইবনে হিল্লিযা ইরাকের বাক্‌র গোত্রের ইয়াশকুর পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা হিল্লিযা ছিলেন একজন বীর যোদ্ধা। কিশোরেই তিনি মারাত্মক কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত হন। বৃদ্ধ বয়সে তিনি রাজা ‘আমর বিন হিন্দের রাজ দরবারে সম্মানের উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন। হারিছই একমাত্র কবি যিনি প্রাক-ইসলামী যুগে আবির্ভূত হয়েও মহাকবি ইমরু’উল ‘কায়েসের প্রভাব মুক্ত হয়ে কবিতা রচনা করেছেন।

১০. মুতালাম্মিস (৫৮১খৃঃ)। প্রাচীন যুগের আরবী কবিদের মধ্যে যে সমস্ত মনিষী রাজ-অনুগ্রহ লাভ করার পর রাজ-রোষের শিকার হন কবি মুতালাম্মিস তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। তিনি আরবের বাহরায়েন প্রদেশের বিখ্যাত দ্বাবী‘আ বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর প্রকৃত নাম জারির ইবনে আবদুল মাসীহ। কিন্তু মুতালাম্মিস তাঁর কাব্যিক নাম। নৃপতি আমর বিন হিন্দ তাঁকে সেরা কবির মর্যাদা দান করেছিলেন এবং তাঁর ভাগ্না ত্বারাফাকেও তাঁর সহকারী নিযুক্ত করেছিলেন।

১১. উরওয়া ইবনে আল-ওয়ারদ (৫৯৬খৃঃ)। প্রাচীন যুগের সাতজন স্বো‘অলুক কবিগোষ্ঠির মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য কবি হলেন উরওয়া। তাঁর জন্ম হয়েছিল আরবের নজদ প্রদেশের ‘আব্‌স গোত্রে। প্রকৃতপক্ষে তিনি গরীবের বন্ধু ছিলেন তাই তাঁকে উরওয়া বলা হত। তাঁর চরিত্র ছিল মহৎ গুনে উদ্ভাসিত।

১২. ‘আল‘কামা ইবনে ‘আবাদা(علقمة الفحل)(৫৯৮খৃঃ)। প্রাক-ইসলামী যুগের সর্বাপেক্ষা খ্যাতিমান কবি ইমরু’উল ‘কায়েসের সমসাময়িক হিসাবে তাঁর সঙ্গে কাব্যিক দ্বন্দ্বে যাঁদের নাম জড়িত তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান হচ্ছেন ‘আল‘কামা। তিনি আরবের নজদপ্রদেশের বিখ্যাত তামীম বংশে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ‘আল‘কামা ইবনে ‘আবাদা ইবনে নু‘আমান ইবনে ‘কায়েস। কাব্যিক দ্বন্দ্বে ইমরু’উল ‘কায়েসের প্রাক্তন স্ত্রী উম্মে জুনদাব তাঁকে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করায় ইমরু’উল ‘কায়েস তাঁকে তালা‘ক দিলে তৎক্ষণাৎ ‘আল‘কামা উম্মে জুনদাবকে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ করেন। তাই তাঁকে ‘আল‘কামাতুল ফাহ্‌ল (علقمة الفحل) বলা হয়।

১৩. ‘আমর বিন কুলছুম (৬০০খৃঃ)। প্রাচীন যুগের যে সমস্ত মনিষী নিজ প্রতিভাবলে স্বীয় গোত্রের মধ্যে নিজ প্রতিষ্ঠা লাভ করতে সমর্থ হয়েছেন মহাকবি আবু ‘আব্বাদ ‘আমর ইবনে কুলছুম তাঁদের সমগোত্রীয়। তিনি ইরাক প্রদেশের মেসোপটেমিয়ার বিখ্যাত তাঘলিব গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র পনের বছর বয়সে তিনি তাঁর গোত্রের প্রধান হন। তাঁর সময়ে হীরার রাজা ছিলেন মাতৃগর্বে গর্বিত ‘আমর ইবনে হিন্দ যাকে কবি ‘আমর তাঁর মায়ের সম্মান রক্ষার্থে হত্যা করেন। তাঁর মু‘আল্লা‘কা وافر ছন্দে ১০৫ পংক্তিতে রচিত।

১৪. ‘কস ইবনে সাইদাতিল আয়াদী (৬০১খৃঃ)। প্রাচীন যুগের যে সমস্ত খৃষ্টান মনিষী আরবী সাহিত্যের চর্চা করে সুনাম অর্জন করেছিলেন ‘কস তাঁদের মধ্যে অন্যতম। নাজরানের আয়াদ গোত্রে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সে যুগের একজন খৃষ্টান পাদরী, তাঁর গোত্রের সর্দার এবং সর্বোপরি একজন প্রখ্যাত দার্শনিক বক্তা। রোম সম্রাট কায়সারের রাজ দরবারে তাঁর আধিপত্য ছিল। নিখিল আরবের বক্তাসম্রাট ‘কসের বক্তৃতার মধ্যে ছিল যাদুকরী প্রভাব। তিনিই সর্বপ্রথম বক্তৃতার মধ্যে اما بعد কথাটির প্রবর্তন করেন। কোন বিবাদের মীমাংসার সময় বাদীকে দোষের প্রমাণ দান করতে হবে আর বিবাদী তা অস্বীকার করলে তাকে শপথ গ্রহণ করতে হবে এই প্রথা তিনিই প্রবর্তন করেন।(البينة على المدعى واليمين على المنكر)

১৫. নাবিঘা (৬০৪খৃঃ)। প্রাক-ইসলামী যুগের প্রখ্যাত তিনজন প্রথম শ্রেণীর (ইমরু’উল ‘কায়েস, যুহায়ের ও নাবিঘা) কবিকুলের অন্যতম সেরা কবি হচ্ছেন নাবিঘা ঝুবইয়ানী। তিনি আরবের হিজাজ প্রদেশের বিখ্যাত মুদ্বার গোত্রের ঝুবিয়ান পরিবারে ৫৩৫ খৃষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম আবু ‘আমামা যিয়াদ ইবনে মু‘আবিয়াহ ইবনে দ্বেবাব আঝ্‌-ঝুবইয়ানী। তাঁর কবিতা ঝর্ণাধারার মত (نبغ الماء)স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে প্রবাহিত হত বলেই তাঁকে নাবিঘা বলা হয়। তিনি ছিলেন হীরা-রাজ তৃতীয় নু‘অমান আবু কাবুসের সভাকবি।

১৬.‘হাতিম ত্বাই (৬০৫খৃঃ)। সুবিখ্যাত দাতা ‘হাতিম ত্বাই আরবের নজদ প্রদেশের বিখ্যাত ত্বাই গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম ‘হাতিম বিন ‘আব্দুল্লাহ ইবনে সা‘আদ (حاتم ابن عبد الله ابن سعد) এবং মাতার নাম ‘ইনাব বিনতে ‘আফীফ। তিনি ছিলে উত্তম চরিত্রের অধিকারী যা প্রাক-ইসলামী যুগে দুর্লভ। তিনি স্বাহাবা عدى بن حاتم এর পিতা। অত্যাধিক দানশীলতার জন্য তিনি ‘দাতা হাতিম’ হিসাবে সমধিক প্রসিদ্ধ। তিনি তার কন্যার নামানুসারে ابو سفنة নামেও পরিচিত। ত্বাই গোত্রের কবরস্থান উরওয়ারেদ্ব পর্বতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।  

১৭. যুহায়ের বিন আবি সুলমা (৬০৭খৃঃ)। তাঁর পুরো নাম যুহায়ের ইবনে আবি সুলমা রাবি‘আ ইবনে রাবাহ্‌। কবির পিতা ছিলেন আরবের নজদ প্রদেশের বিখ্যাত মুযায়না গোত্রের সন্তান। কবির পুত্র ক‘আব ও বুজায়ের পরবর্তীকালে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দূরদর্শী, প্রজ্ঞাশীল, ধর্মভীরু এবং পরকাল সচেতন কবি। কথিত আছে তিনি চারমাসে একটি কবিতা রচনা করতেন, তারপর চারমাস ধরেতিনি উহার পরিমার্জন করতেন, এবং আরও চারমাস ব্যয় করতেন তাঁর পরিচিত কবি মহলে আলোচনা সমালোচনার জন্য। এইভাবে পূর্ণ এক বৎসর অতিবাহিত হওয়ার পর তিনি তাঁর কবিতা জনসাধারণের নিকট প্রকাশ করতেন। انه كان ينظم القصيدة فى اربعة اشهر ويهذبها فى اربعة ويعرضها على اخصائه فى اربعة

১৮. ‘কয়েস ইবনে আল-খাত্বিম (৬১২খৃঃ)। তিনি জন্মগ্রহণ করেন আরবের ইয়াছরেব শহরের (মদীনা) বিখ্যাত আউস গোত্রে। তাঁর পূর্বপুরুষগন ছিলেন পারস্যের অধিবাসী।

১৯. আবুল মুগাল্লিস ‘আনতারা ইবনে শাদ্দাদ আল-‘আবাসী (৬১৫খৃঃ)। তিনি ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবের নজদ প্রদেশের বিখ্যাত‘আব্‌স্‌ গোত্রে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর জনক শাদ্দাদ ছিলেন ‘আব্‌স্‌ গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। তাঁর জনক যাবীবা ছিলেন একজন আবিসিনীয় ক্রীতদাসী। কবি হিসাবে তাঁর যেমন দ্যুতি ছিল, সৈনিক হিসাবেও তেমনি খ্যাতি ছিল। তাঁর প্রেমিকার নাম আবলাহ্‌। ‘আনতারার মু‘আল্লা‘কা দীর্ঘ ছন্দে ৮২ পংক্তিতে রচিত।

২০. হুসায়েন ইবনে হুমাম (৬২১খৃঃ)।الحصين بن الحمام بن ربيعة  ছিলেন কায়েস গোত্রের বনু সাহ্‌ম ইবনে মাররা পরিবারের নেতা। তিনি প্রাক-ইসলামী যুগে মূর্তি পূজার বিরোধী হিসাবে প্রসিদ্ধ ছিলেন।



প্রাক-ইসলামী যুগের  আরও কয়েকজন কবি

Ø  যুহায়ের ইবনে জনাব (৫০০ খৃঃ)।তাঁর জন্ম ইয়ামেনের কুদ্বাআ গোত্রের কাল্‌বশাখায়।

Ø  আবু দুয়াদ আল--ইয়াদী (৫২০খৃঃ)। ইরাক প্রদেশের আল-ইয়াদ গোত্রে তাঁর জন্ম হয়।

Ø  ওয়ারাকাহ ইবনে নাওফাল (৫৯২খৃঃ)। তিনি কোরায়েশ বংশের একজন প্রথিতযশা বিজ্ঞ খৃষ্টান পণ্ডিত। তিনি খাদিজা (রাঃ) এর পিতৃব্য পুত্রইহুদী ও খৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রে তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল।

Ø  ‘আদী ইবনে যায়েদ আল-ইব্বাদী (৫৯৭খৃঃ)। হীরার বিখ্যাত আবাদ বংশে তাঁর জন্ম হয়।

Ø  মুনাখখাল ইবনে ‘আবীদ (৫৯৮খৃঃ)। হীরা রাজ তৃতীয় নু‘অমানের সভাষদ। ইরাকের বিখ্যাত বাকর-ওয়ায়েল বংশের ইয়াশকুর পরিবারে তাঁর জন্ম।

Ø  সুলায়েক ইবনে আস্‌-সালাকা (৬০৫খৃঃ)। তাঁর জন্ম হয় ইয়ামেনের বিখ্যাত সা‘অদ গোত্রে। তিনি ছিলেন প্রাচীন আরবের দুজন কৃষ্ণ দাসের (আনতারা ও সুলায়েক) অন্যতম। মুফাদ্দাল আদ্ব্‌দ্বাব্বী তাঁকে আরবের দুর্ধর্ষতম দুর্বৃত্ত, ঘৃন্যতম ব্যক্তি ও সেরা কবি বলে উল্লেখ করেছেন।

Ø  আউস ইবনে হাজার (৬১০খৃঃ)। প্রাক-ইসলামী যুগের  একজন নেতৃত্ব স্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর জন্ম হয় ইয়ামেনের বিখ্যাত তামীম গোত্রেতিনি মহাকবি যুহায়েরের প্রথম জীবনের রাবি ছিলেন।